রবিবার, নভেম্বর ৩০, ২০২৫
spot_img
Homeএই মুহূর্তের আলোচিতঅর্থনীতির ছাত্র যখন পেশাদার সাংবাদিক

অর্থনীতির ছাত্র যখন পেশাদার সাংবাদিক

ফারুক মেহেদী। দৈনিক কালের কণ্ঠের হেড অব নিউজ বা বার্তাপ্রধান। দেশের গণমাধ্যমে এই নামেই তিনি বেশি পরিচিত। এটা সত্য যে, তার দাপ্তরিক নাম মোহাম্মদ ফারুক আহাম্মদ। কিন্তু সাংবাদিকতা, কলাম লেখা, টকশোতে কথা বলা বা সংবাদভিত্তিক প্রামাণ্য চিত্র নির্মাতা হিসেবে ফারুক মেহেদী নামটিই সবার কাছে অনেকটা ব্র্যান্ডের মত। আজকে বাংলাদেশে স্বনামধন্য অনুসন্ধানী বিজনেস বা বাণিজ্য খাতের সাংবাদিক হিসেবে যে কজনের নাম আসবে, তাদের মধ্যে ফারুক মেহেদী অন্যতম। সেরা সাংবাদিকের পুরস্কারসহ নানান সম্মাননায় ভূষিত এ সাংবাদিক তার ৩০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনের পুরোটা সময় নেশার মত বস্তুনিষ্ঠ ও সত্ সাংবাদিকতায় নিয়োজিত ছিলেন। কোনো রক্তচক্ষু কিংবা ভয়-ভীতি তাকে কখনও কাবু করতে পারেনি। নিজে পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে সমাজে খ্যাতি ও স্বীকৃতি পেলেও কখনও কখনও তিনি বিভিন্ন খাতের সাংবাদিকদের দেয়া পুরস্কার ও সম্মাননায় বিচারক বা জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু শুরুটা তার এমন ছিল না। বলা যায়, কঠিন সংগ্রাম করে তিনি আজকে দেশের অন্যতম সেরা সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। মফস্বল শহর সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি যখন অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ করে আর কোনো পেশায় না গিয়ে চোখ বন্ধ করে এ পেশায় যুক্ত হোন, তখন তার সামনে কেবলই বাধার পাহাড়। রাজধানী ঢাকায় অচেনা পরিবেশে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে পেশাদার সাংবাদিকতা শুরু করেন। কিন্তু মনে ভয় ও আতংক। তখনও তিনি রাজধানীর ঢাকার অলিগলি চেনেন না। নেই কোন ভালো জানাশোনা বা সোর্স। দেশের নামকরা সাংবাদিকদের ভিড়ে নিজেকে কতটাই বা প্রমাণ করতে পারবেন? নিজের সাথেই নিজের বোঝাপড়া। কিন্তু পেছনে নয়; যেতে হবে সামনে-এই মনোবলই তাকে শত প্রতিকুলতার মধ্যেও টিকে থাকার প্রেরণা যোগায়। এই মূলমন্ত্রে উদ্দীপ্ত ফারুক মেহেদী দৈনিক মানবজমিনে রাজস্ব খাতের সাংবাদিক হিসেবে নাম লেখান। এর আওতায় আয়কর, মূসক বা ভ্যাট ও শুল্ক উপখাতের বিচিত্রসব রিপোর্ট করা শুরু করেন। প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি, মিথ্য ঘোষণা পণ্য আমদানির আড়ালে শুল্ক ফাঁকি ও মুদ্রা পাচার আর ভোক্তার কাছ থেকে নেয়া ভ্যাটের টাকা ফাঁকি দেয়ার ঘটনা নিয়ে একের পর এক বিশেষ ও এক্সক্লুসিভ রির্পোট করে অল্প দিনেই তিনি সবার নজর কাড়েন। এরপর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধু সামনে ছুটে চলা। দৈনিক মানবজমিন থেকে দৈনিক যায়যায়দিন হয়ে এরপর পদোন্নতি নিয়ে সিনিয়র রির্পোটার হিসেবে বৈশাখী টেলিভিশনে গিয়ে টেলিভিশন সংবাদিকতায় ক্যারিয়ার শুরু করেন। বৈশাখী টেলিভিশনে তিনি তথ্য-প্রমাণভিত্তিক রাজস্ব রিপোর্ট তৈরিতে নতুন ধারার সূচনা করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি কর-রাজস্বের রিপোর্েটর ভিজুয়াল ফর্ম তৈরিতে বিশেষ মুন্সিয়ানা দেখান। বড় বড় এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট করে বেশ সাড়া ফেলেন সবার মধ্যে। এরই ধারবাহিকতায় আরটিভিতে কাজ শুরু করেন। সেখানেও তিনি অনেক আলোচিত প্রতিবেদন তৈরি করে আলোচনার জন্ম দেন। ওই সময়ে ইস্যুভিত্তিক বিশেষ প্রতিবেদন তৈরিতে দক্ষতার কারণে তিনি ওই টেলিভিশনের চলতি ঘটনার টকশোগুলোতেও কখনও প্যানেল সাংবাদিক হিসেবে কখনও বা গেস্ট হিসেবে অংশ নেন। এরই মধ্যে তিনি আরটিভি ছেড়ে নতুন বাজারে আসা দৈনিক পত্রিকা কালের কণ্ঠে যোগ দেন। সেখানে যোগ দিয়েই তিনি একের পর এক ব্রেকিং নিউজ করতে থাকেন। রাজস্ব খাতের ঘুষ, অনিয়ম, দুর্নীতির রিপোর্ট যেমন করেছেন, তেমনি কালোটাকার মালিক, কর ফাঁকিবাজ প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও সমানে রিপোর্ট করে গেছেন। ওই সময়ে পুঁজিবাজার কেলেংকারি নিয়ে তার একটি আলোচিত ব্রেকিং রিপোর্ট দেশে তোলপাড় তুলে। কারণ ওই প্রতিবেদনের সাথে দেশের ৬ প্রভাবশালী ব্যক্তির ছবি ছাপা হয়, যাদের কয়েকজন পরে তত্কালীন আওয়ামী সরকারে মন্ত্রী হোন। কালের কণ্ঠের আট কলামজুড়ে ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘এরাই শেয়ার কেলেংকারির নায়ক।’ এটি ছাপা হওয়ার পর দেশের সব পত্রিকা ওই প্রতিবেদন ধরে রিপোর্ট করে। পর পর তিন দিন ধারাবাহিক ভাবে কালের কণ্ঠে প্রধান শিরোনাম হিসেবে প্রতিবেদনগুলো ছাপা হয়। এরপর সর্বত্র এই বিষয়টিই ‘টক অব দি কান্ট্রি’ হয়ে যায়। এই প্রতিবেদনটির জন্য কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ তাকে পুরস্কার ও সম্মাননা দেয়। এক পর্যায়ে কালের কণ্ঠ ছেড়ে আবারও তিনি ফিরে যান টেলিভিশন সাংবাদিকতায়। যোগ দেন নতুন সম্প্রচারে আসা সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল ‘চ্যানেল টোয়েন্টিফোর’ টিভিতে। সেখানেও তিনি সমানে একের একের পর এক বিশেষ প্রতিবেদন করতে থাকেন। বিজনেস এডিটর হিসেবে ওই টিভি চ্যানেলে তিনি দায়িত্ব পালন করলেও তখন তার তৈরি করা প্রায় প্রতিটি বিশেষ রিপোর্টই ছিল আলোচিত। তবে তার বেশির ভাগ রিপোর্টই ছিল কর ফাঁকি নিয়ে। এসব রিপোর্ট রাজস্ব খাতে সুশাসন ও নজরদারি বৃদ্ধি, মুদ্রা পাচার রোধ, রাজস্ব আয় বাড়ানোতে সহায়তা করা ও করদাতাদের সচেতন করায় অবদান রাখায় সরকারি সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর তাকে জাতীয় ভাবে রাজস্ব খাতের সেরা সাংবাদিকের পুরস্কার ও সম্মাননা দেয়। এক সময় তার হাজার কোটি টাকার মুদ্রা পাচার নিয়ে একটি অনুসন্ধানী ধারাবাহিক প্রতিবেদন বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। পরে এই প্রতিবেদনের জন্য তিনি রির্পোটারদের জাতীয় পর্যায়ের সেরা সংগঠন ‘ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-ডিআরইউ’ এর সেরা সাংবাদিকের পুরস্কার অর্জন করেন। চ্যানেল টোয়েন্টিফোরে তিনি বিজনেস এডিটর হিসেবে নিয়মিত একটি বিজনেস শো সঞ্চালনা করেন। সপ্তাহে একদিন করে সরাসরি সম্প্রচারিত ‘টুওয়ার্ডস গ্রোথ’ নামের ফ্ল্যাগশিপ এ বিজনেস শো’তে অতিথি হিসেবে আসতেন দেশসেরা ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ, মন্ত্রী, সচিব ও ব্যবসা-বাণিজ্য খাতের সেলিব্রিটি ব্যক্তিত্বরা। টানা ছয় বছর ধরে চলা এর পর্ব ছিল ২৫০টি। এর বাইরেও তিনি অনিয়মিত ভাবে রাজনৈতিক টকশো ’মুক্তবাক’ও সঞ্চালনা করেন। একই সময়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়েও বাণিজ্য ও অর্থনীতির বড় বড় ইভেন্ট কাভার করেন। বিজনেস এডিটর হিসেবে প্রতিদিন তিনটি বিজনেস বুলেটিন, প্রতিদিন একটি বিজনেস টকশো এবং সপ্তাহে একদিন একটি বিজনেস শো তার নেতৃত্বে সম্প্রচারিত হয়েছে। বিজনেস টিমের নিউজ পরিকল্পনা, অ্যাসাইনমেন্ট, স্ক্রিপ্ট সম্পাদনা থেকে শুরু করে সার্বিক কার্যক্রম তিনি পরিচালনা করতেন। চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের সাথে আট বছরের পথচলা শেষ করে তিনি সিনিয়র বিজনেস এডিটর হিসেবে আবারও যোগ দেন দৈনিক কালের কণ্ঠে। সেখানে তিনি বাণিজ্য বিভাগ পরিচালনা, নিয়মিত বিজনেস পাতা বের করার পাশাপাশি নিজেও বিশেষ রিপোর্ট করা, বিশেষ সংখ্যা বের করা, সপ্তাহে একদিন ১৬ পৃষ্ঠার একটি ট্যাবলয়েড বের করা, ডিজিটাল ও মাল্টিমিডিয়া শো সঞ্চালনা করেছেন। টিমের সদস্যদের স্ক্রিপ্ট সম্পাদনার পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন কাজের তদারকি, পরিকল্পনা করা ও অ্যাসাইমেন্ট দিতেন। কালের কণ্ঠের পর তিনি সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন নতুন ভাবে বাজারে আসা দৈনিক আজকের পত্রিকায়। সেখানে সম্পাদকীয় বিভাগে তিনি সমসাময়িক বিষয়ে নিয়মিত কলাম লিখেন। পাশাপাশি বিজনেস ডেস্কেরও প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একাধারে বিজনেস টিম পরিচালনা ও নিজেও প্রচুর বিশেষ রিপোর্ট করেন। এক পর্যায়ে তিনি পত্রিকাটির উপসম্পাদক হিসেবে পদোন্নতি পান। আজকের পত্রিকায় তিন বছরেরও বেশি সময় কাজ করে আবার তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠে বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। এ পদে থেকে তিনি পত্রিকাটির নিউজরুমের প্রধান হিসেবে সার্বিক নিউজ ব্যবস্থাপনা, পত্রিকার পরিকল্পনা, নিউজ সম্পাদনার যাবতীয় বিষয় নেতৃত্ব দেন ও তদারকি করেন। পাশাপাশি নিজেও নিয়মিত ভাবে বিশেষ রিপোর্ট করেন। এক পর্যায়ে তিনি পদোন্নতি পেয়ে পত্রিকাটির হেড অব নিউজ বা বার্তা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। এখনও ওই পদে থেকে কালের কণ্ঠের পুরো সংবাদ ব্যবস্থাপনা, স্ক্রিপ্ট সম্পাদনা, পত্রিকা প্রকাশসহ সার্বিক বিষয় তদারকি করছেন। এসবের বাইরে তিনি সমসাময়িক বিষয়ে মন্তব্য প্রতিবেদনও লিখে থাকেন। যা সমাজে ও সরকারের নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে নীতি প্রণয়নে সহায়তা করছে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি ফারুক মেহেদী বিভিন্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে এডজাংক্ট বা খন্ডকালিন শিক্ষক হিসেবে পড়িয়েছেন। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিজনেস সাংবাদিকতার ওপর একটি পূর্ণ কোর্স পড়িয়েছেন। বিজনেস সাংবাদিকতার প্রিয়মুখ ফারুক মেহেদী বিভিন্ন টেলিভিশনের টকশো’র নিয়মিত আলোচক। বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বেসরকারি টেলিভিশনে ব্যবসা, বাণিজ্য অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনীতির বিভিন্ন জটিল বিষয়ের টকশোতে অংশ নিয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কথা বলে থাকেন। প্রামান্য চিত্র নির্মাণেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তার বেশ কিছু প্রামান্য চিত্র দেশে বিদেশে প্রদর্শিত হয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের জীবন ও কর্মের ওপর নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র ‘শিকড়’ দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। সৃজনশীল প্রামাণ্য চিত্রের পাশাপাশি তিনি করপোরেট প্রামাণ্য চিত্রও নির্মাণ করে থাকেন। সাংবাদিকতা নিয়ে তার লেখা গ্রন্থ ‘টেলিভিশন সাংবাদিকতা: দেখা থেকে লেখা’ সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের কাছে বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তার প্রকাশিত বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে স্থান পেয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের রেফারেন্স বুক হিসেবেও এগুলো পঠিত হচ্ছে। ইংরেজিতে প্রকাশিত তার সম্পাদিত ‘গ্লোবাল লিডার’ গ্রন্থটি বিশ্বখ্যাত ইকমার্স প্ল্যাটফর্ম ‘অ্যামাজন ডটকম’ এ তালিকাভূক্ত এবং এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বাজারজাত হচ্ছে। চলতি বছর প্রকাশিত সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তার লেখা কলাম সমগ্রের সংকলন গ্রন্থ ‘এক মেন্যুতে লাঞ্চ, ডিনার-ব্রেকফাস্ট’ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। এই গ্রন্থটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতেও স্থান পেয়েছে।

রিলেটেড আর্টিকেলস
- Advertisment -
Google search engine

জনপ্রিয় খবর

Recent Comments